শ্রী চিন্ময় সেন্টার, ঢাকা-র পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগত জানাই ! 

meditation_class.png

বাংলা ও বাঙালির মানবিক মায়া,মমতা,শ্রদ্ধা,ভালবাসা ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক মূর্ত প্রতীক শ্রী চিন্ময়। শ্রী চিন্ময় বাংলাদেশের  চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরা গ্রামে ১৯৩১ সালে জন্ম গ্রহন করেন। বার বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে মা বাবা উভয়কে হারানোর পরে শ্রী চিন্ময় দক্ষিন ভারতের পন্ডিচেরির শ্রী অরবিন্দের আশ্রমে যোগ দেন। এখানে আধ্যাত্মিক সাধনায় তিনি জীবনের পরবর্তী ২০ বছর কাটান ।

শ্রী চিন্ময়ে কৈশোরেই মেডিটেশনের ক্ষেত্রে সুগভীর কিছু আত্মিক অনুভুতি পান এবং পরবর্তী কালে ধ্যানের সর্বোচ্চ অনুভুতিও তিনি লাভ করেন। পাশ্চাত্যের অকৃত্তিম সাধকদের সাথে তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ভাগ করার জন্যে তিনি ১৯৬৪ সালে নিউইয়র্কে পাড়ি দেন।

 
শ্রী চিন্ময়ের জীবন ছিল সীমাহীন সৃজনশীলতার এক মূর্ত প্রতীক। সংগীত, কাব্য, চিত্রকলা, সাহিত্য এবং ক্রীড়ার মত জ্ঞ্যান ও কর্মের বিস্তৃত সব ক্ষেত্রে তিনি বিপুল সৃষ্টির সাক্ষর রেখে গেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর রয়েছে সুদূর প্রসারী ও বিস্ময়কার সব কীর্তি।
 
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শ্রী চিন্ময় মানুষের অসীম সৃজনী শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। সৃজনশীলতার তিনি নিজেই এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি তের হাজার বাঙলা ও আট হাজার ইংরেজী গান রচনা করেছেন। প্রায় এক হাজার ছয় শত পুস্তক রচনা করেছেন। হাজার হাজার ছবি এঁকেছেন। ঝর্ণাকলা নামে খ্যাত তাঁর চিত্রশিল্পে রয়েছে বহু বর্ণিল ও নানা চিন্তার সমাহার। 
 
শ্রী চিন্ময়ের মতে জীবনের সুগভীর ও উচ্চ আদর্শের জন্যে হৃদয়ের আকুতিই হচ্ছে যেকোন ক্ষেত্রে – ধর্ম, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে অগ্রসর হওয়ার আধ্যাত্মিক শক্তি। যদি কেউ আন্তরিকভাবে যেকোন বিষয়ে নিজের সীমা অতিক্রমের জন্যে উদ্যোগী হয় তাহলে অবশ্যই সে নিজের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে সফল ভাবে বিকশিত করে নিতে পারে এবং সত্যিকার আত্মতৃপ্তি পেতে পারে। তাঁর নিজের ভাষায়:
 
“আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর এবং উজ্জ্বলতম পৌঁছানো; এবং উচ্চ থেকে উচ্চতর এবং সর্বোচ্চ পৌঁছানো। এমনকি সর্বোচ্চ পর্যায়েও আমাদের কোন বিরতি নেই কারণ আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই রয়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা যিনি প্রতি মুহুর্তেই তাঁর নিজস্ব বাস্তবতাকে বিকশিত করছেন।"
 
ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সমকালীন জীবনের গতিশীলতার ভেতরে থেকেই ভারসাম্যপূর্ণ জীবন পরিচলনায় তিনি প্রেরণা দেন।সমকালীন জীবনের গতিশীলতার ভেতরে থেকেই ভারসাম্যপূর্ণ জীবন পরিচলনায় তিনি প্রেরণা দেন।
 
ক্রীড়া ক্ষেত্রে তিনি এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। ছিয়াত্তর বছর বয়সে থাইল্যান্ডে তিনি পর পর সাতটি হাতি উত্তোলন করে সবাইকে বিস্মিত করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ম্যারাথন টিম বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দৌড় ও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। ‘ওয়ার্ল্ড হারমনি রান’ প্রতিবছর বিশ্বের শতাধিক দেশের মানুষকে মিলিত করে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের দীর্ঘতম তিন হাজার একশত মাইল দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগিরা প্রতিদিন আশি থেকে একশত মাইল দৌড়ায়-টানা ৫১ দিন, ভোর ছয়টা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত।
 
শ্রী চিন্ময় ১৯৭০ সাল থেকে ২০০৭ এ পরলোক গমনের আগে পর্যন্ত জাতিসংঘের সদর দফতরে পীস মেডিটেশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।শ্রী চিন্ময়ের আদর্শ, স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে ভালবাসা। মা যেমন বাচ্চার কান্না শুনে আকুল হয়ে ছুটে আসে তেমনি শ্রী চিন্ময় যেখানেই আর্ত মানবতার ক্রন্দন শুনেছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন, সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়ান্নেস-হার্ট-টিয়ার্স এন্ড স্মাইল’ সংগঠনটি বিশ্বের ১৫০টির ও বেশি দেশে যথাসাধ্য খাদ্য দ্রব্য, ঔষধ, ও শিক্ষা সামগ্রী পাঠিয়ে তাঁর বাঙ্গালী হৃদয়ের সংবেদনশীলতা প্রকাশ করেছেন। যেমন কলকাতার মাদার তেরেসার মিশনারিতে বা মস্কোতে মিখাইল গর্বাচেভের শিশুদের ব্লাড কেন্সার চিকিৎসা কেন্দ্রে, এঙ্গোলার ক্ষুধার্ত শিশুদের ও বাংলাদেশের বন্যাপীড়িত মানুষদের তিনি সাধ্যমত সাহায্য পাঠিয়েছেন। 
 
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা, তাকে জাগ্রত করে সমস্ত মানবতার কল্যানে তা নিয়োজিত করাই ছিল তাঁর সাধনা। তাই তিনি বিশ্বের অগণিত মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। নয়টি অলিম্পিক সোনা বিজয়ী কার্ল লুইস তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত। মোহাম্মদ আলী ক্লে বিশ্ব শিরোপা জয়ের পরদিন নিউ ইয়র্ক টাইমসে আলী ও শ্রী চিন্ময়ের ছবি একত্রে প্রকাশিত হয়ে ছিল। তাঁর ছাত্র/ছাত্রীদের অনেকেই ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী, এদের মধ্যে ৫৯ বছর বয়সে চ্যানেল বিজয়ী নারীও রয়েছেন। পরশ পাথরের ছোঁয়ায় সব কিছুই নাকি সোনা হয়ে যায়; তাঁর অনুপ্রেরণায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে অনেকেই বিখ্যাত হয়েছেন, অনেকেই হতাশা কাটিয়ে মানসিক সুখ ও প্রশান্তি লাভ করেছেন।
 
বিশ্বের দেশে দেশে,জাতিতে জাতিতে শান্তি, মৈত্রী ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি বিশ্বময় প্রায় ৮০০ একক কনসার্টের আয়োজন করেছেন। সবই দর্শকদের জন্যে বিনামূল্যে। কারন তিনি মনে করতেন,শারিরিক সুস্থতার মত মানসিক শান্তি ও সুস্থতার জন্য মেডিটেশন, ক্রীড়া, সংস্কৃতি চর্চার অধিকার রয়েছে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের। তাঁর ছাত্র ও অনুসারিদের সাথে মিলিত হতে, বিশ্বের ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে বিশ্বশান্তি ও আধ্যাত্মিক আলোচনার জন্যে ও সংগীতের কন্সার্ট, বক্তৃতা, সার্বজনীন ধ্যান সভা করার জন্যে শ্রী চিন্ময় প্রায়ই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতেন। শ্রী চিন্ময় কখনোই তাঁর আধ্যাত্মিক বক্তব্য, সংগীত কনসার্ট বা ধ্যান সভার জন্য অর্থ গ্রহন করেন নি। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছাত্র/ছাত্রীরা  বিশ্বব্যাপী বিনামূল্যে মেডিটেশন শিক্ষা দিয়ে থাকে।